Monday, 9 July 2018

বাইকে বোলপুর …

বাইকে বহু জায়গায় ঘুরতে গেলেও একা কোনোদিনও জাইনি | সেই কারনে ১০০ কিঃমিঃ এর অধিক কোনো জায়গায় বাইকে যাবো ভাবলে ভয় লাগতো | আমার মাথার ঘোরার পোকা যে কখন চাগাড় দিয়ে ওঠে তার ঠিক থাকেনা তাই আমার সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সবার হয়ে ওঠে না উপরন্তু আমার নিরিবিলি ভ্রমন যাকে কিনা সোলো ট্যুর বলে ,করতে বেশী ভালোলাগে |
        সাহস করে বেরিয়ে পরলাম | কিছুটা যাওয়ার পর আরষ্ঠতা কেটে গেলো , আমার মতো ভীতু যে কিনা ৪০ গতিবেগে বাইক চালাতে ভয় পায় সে 80-100 গতিবেগে নিশ্চন্তে বাইক চালিয়ে গেলো | 3 ঘন্টা 30 মিঃ লেগেছিলো বিশ্বভারতী ডুকতে | মাঝে দু জায়গায় বিশ্রাম নিয়েছিলাম | এক জায়গায় চা খেয়েছিলাম এবং শক্তিগড়ে গিয়ে সকালের খাবার সঙ্গে বিখ্যাত শক্তিগড়ের ল্যাংচা |
        পুরো রাস্তা অপূর্ব সুন্দর বিশেষ করে বর্ধমান থেকে বোলপুরের রাস্তাটি | দুদিকে হয় সবুজ খেত নাহয় গাছের সারি | মাঝে জঙ্গল চিরে গিয়েছে পাকা রাস্তা | মনে এক অদ্ভূত শান্তি চলে এসেছিলো এই সময় , গভীর মন থেকে বারবার করে চিত্কার করে বলতে ইচ্ছা করছিলো ‘Wow,just wow!’
        ইন্টারনেটে আগে থেকেই হোটেল বুক করে রেখেছিলাম , হোটেলের নাম রবিঙ্কনা | সায়রবিথি পার্কের বিপরীত দিকে এবং ফার্মভিলে রিসর্টের পাশে |
       ঘরে ডুকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পরলাম শান্তিনিকেতন ঘুরতে ,রবী ঠাকুরকে আরেকবার চিনতে | ওনার আঁকা ছবি আর কাঠের কাজ গুলো দেখে কেবল মুগ্ধ হয়েছি তা নয় , লজ্জাও পেয়েছি এই ভেবে যে আমাদের মতো তুচ্ছ মানুষরা এনার সমালোচনা করার সাহস দেখাই |
        লাল মাটির দেশ ,গাছগাছালি আর এক নিরিবিলিতা | হারিয়ে যাওয়া যায় এখানে | কোনো এক গাছের তলায় চুপচাপ বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায় |
     খোয়াই মেলায় বেশী সময় দেবো বলে আগে অন্য জায়গাগুলি দেখে নিয়েছিলাম| খোয়াইয়ে গিয়ে শকুন্তলা ভিলেজের কলাপাতায় দেওয়া ভাত খেলাম | দাম স্বাভাবিকের তুলনায় বেশী কিন্তু চমতৎকা্য স্বাদ | মাটির গেলাসে জল | গ্রাম্য পরিবেশের ক্ষুদ্র সংস্করন এটা | খোয়াইয়ের জিনিসপত্র দেখা এবং ওখানকার বাউলগান শোনা সবই করলাম | তবে মন ছুঁয়েছিলো দুটো ঘটনা| এক , আদিবাসীদের ট্রাডিশনাল নাচ , দুই , খোয়াই হাটের বহুরূপীর সাথে কয়েকজনের সেলফি তোলা ।বহুরূপী তখন ভূত সেজে চুপচাপ দাড়িয়ে ছিলো এবং সামনে একটা কাগজে লেখা 'বহুরূপীর মেয়ের একটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে তার চিকিৎসার জন্য সাহায্য দরকার।' মনে মনে একবার হাসলাম কেবল ।
      এরপর কোপাইয়ে গেলাম কিন্তু সেই কোপাইকে কেনো জানিনা মনে ধরলোনা । ফোঁটাফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়েছিলো ,তাড়াতাড়ি হোটেলে চলে এলাম ।
       ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে দেখি ঝড় ও বৃষ্টি ভালোই শুরু হয়েছে । আমি শান্তিনিকেতন গেলে শান্তিনিকেতন আমায় নিরাশ করেনা । সুন্দর এক আবহাওয়া উপহার  দেওয়া শুরু করলো।
    কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই এতো ভয়ানক রূপ নিলো যে ভয় লাগতে শুরু করলো । নিচে হোটেলের কর্মচারিদের কাছে এলাম , ঝড় উত্তোরত্তর বেড়েই চললো । হোটেলের আমগাছটা বারবার মনে হচ্ছিলো এই বুঝি ভেঙে পরবে ।
    হঠাৎ এক বিশাল বাজ পরার আওয়াজ , হোটেলের পিছনের জানলার কাছে গিয়ে দেখি ফার্মভিলে দাউদাউ করে জ্বলছে । যতো বেশি হাওয়া দিচ্ছে ততো বেশি আগুন ছড়াচ্ছে ।
     তুমুল বৃষ্টি সঙ্গে ভয়ঙ্কর ঝড় , তাতেই আগুনের শিখা আরো উপরের দিকে উঠতে লাগলো । ঝড়ের শব্দে আর কোনো আওয়াজ শোনা যাচ্ছিলোনা । মনে পড়ে গেলো চাঁদের পাহাড়ের সেই দৃশ্যের কথা , সেই অগ্নিদেবের জাগরণ , সেকি অদ্ভূদ আর বিভৎষ রুপ। সকলে নিরুপায় হয়ে বসে র‌ইলাম । আতঙ্কের রাত , যেনো শেষ হতেই চায়না ‌। অনেকক্ষন পর যখন ঝড় বৃষ্টির সাথে আগুন প্রায় নিভে এসেছে তখন দমকলের ঘন্টার আওয়াজ শোনা গেলো । পরে জানতে পেরেছিলাম দমকল ডুকতে পারিনি কারন দুদিকেই গাছ ভেঙে পড়েছিলো । রাতে খাওয়া হবেনা ধরেই ঘরে গেলাম । ওই দৃশ্যের পর আমার পক্ষে একা খাওয়ার আন্তে যাওয়া সম্ভব ছিলোনা তায় শুনতে পেয়েছিলাম যে রাস্তা  কারেন্টের তাঁর ছিঁড়ে পরে আছে । এমন সময় পাশের ঘরের এক লোক খাবার আন্তে যাচ্ছে বলে হোটেলের কর্মচারীরা আমায় ডেকে বললো উনি খাবার আনতে যাবে আপনি খাবার আনতে চাইলে চলে যান । বেরিয়ে পরলাম , ভাঙা গাছ আর ছেঁড়া তাঁর কোনোমতে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পার করে গেলাম অনতিদূ্রের  'ঝালেঝোল' দোকানে । আমি চিকেন চাউ আর লোকটি ফ্রায়েড রাইস কিনলেন ।
      ৬০ টাকার বিনিময়ের চাউমিনটা ছিলো মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। মাংসের টুকরোগুলো আমরা যেরকম খাই সেরকম নয় , রোস্টেড টাইপের । আর প্রচুর মাংস।
     ছবিগুলো একবার দেখে নিয়ে শুয়ে পরলাম । ভোর ভোর ঘুম ভাঙার পর হাঁটতে বেরোলাম । কোকিলের ডাক কি সুন্দর লাগছিলো । কিছু লোক ভেঙে পরে থাকা গাছগুলো সরাচ্ছিলো । এক কাপ চা খেয়ে ফিরে এলাম । হোটেলের দোলনায় কিছুটা সময় কাটিয়ে ছাঁদে গেলাম । ওখানে আলাপ হলো এক দাদার সাথে । ওরা যেতো কাংকালী মন্দিরে। আমায়‌ও যাওয়ার জন্য বললো । বেরিয়ে পড়লাম । ওরা টোটোয় আমি বাইকে । ওরা পুজো দিলো , তারপর গেলাম কাছের কোপাইয়ে। এখানকার কোপাই বেশ সুন্দর । গরম গরম কচুরী খেয়ে আমরা বেরিয়ে পরলাম । ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে চলে গেলো আমি হোটেলে ফিরে এলাম । ৩০ মিঃ মতো বিশ্রাম নিয়ে ফেরার জন্য বেরিয়ে পরলাম । আমার মনে হয়েছিলো দিনের বেলায় বেরোচ্ছি রাস্তায় অনেক গাড়ি থাকবে হয়তো তাই সময় হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি । এই ধারনা ভুল ছিলো তা বাড়ির কাছে এসে বুঝতে পারলাম । বর্ধমানের ১০৮ শিবমন্দির নেমে একটু ঘুরে তারপর শক্তিগড়ে এসে লাঞ্চ করে , বাড়ির জন্য ল্যাংচা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম । ফেরার সময় সামান্য কম সময় লেগেছিলো রাস্তা বেশী ফাঁকা থাকা  ।
          শান্তিনিকেতন এক আবেগ , ভালোবাসার , ভালো থাকার জায়গা । আবেগ ও স্মৃতিময় থাকুক এই পরিবেশ....আবার দেখা হোক কোনো একদিন....

No comments:

Post a Comment