সবচেয়ে বড়ো নেশা কী জানো ?
এডভেঞ্চার ....
৭ মাস ,দীর্ঘ ৭ মাসের প্রতীক্ষা , নানা ইনক্লুসন-কনক্লুসন । কাট ছাট , ইনপুট-আউটপুট আরো কতো কি ! শেষ মেশ করলামই ।
৭ মাস আগে প্ল্যান করা শুরু করি -প্ল্যানিংটা ছিলো এরকম যে বাইক নিয়ে সিকিম যাবো । প্রথমে গুরুদম্ভার ভাবলেও রাস্তার কথা ভেবে পিছিয়ে এসেছি । যখন জগার(আমাদের ম্যারেড ব্যাচেলর) সাথে আলাপ হয় তখন জগাকে বলেছিলাম কেওনা বেরোলে আমি একাই বেরোবো । জগা বলেছিলো তুই বেরোবি তো ? তাহলে আমিও বেরোবো । ফেসবুক মেট এভাবেই বন্ধু হয়েছিলো ঠিক যেভাবে থর সিনেমায় লোকি একজন এভেঞ্জার হয়ে উঠেছিলো থ্যানোসকে "We have Hulk" বলায় ।
মানুষের তেষ্টা পায় জলের আর আমার ঘোরার । একদমই বাড়িয়ে বলছিনা । আমি ঘুরতে পাহাড় যাইনা , যাই মিশে যেতে ।
প্রকৃতি খুব কম সময় আমায় নিরাশ করেছে আর যখন করেছে সেটা দরকারেই করেছে ।
রূপকুন্ড ট্রেকের সময় সবসময় আগে ছিলাম এমনকি ট্রেক লিডারেরও আগেও । একটা সময় ভালোবাসার বদলে অহং এসেছিলো যে আমি বিশাল হনু । এই পাহাড় তুচ্ছ । শেষ ২ কিঃমিঃ যেতেই পারিনি । AMS চলে এসেছিলো । তারপর থেকে পাহাড়ের কাছে নত হয়েছি পাহাড় আমায় উজাড় করে দিয়েছে ।
বাইক নিয়ে পাহাড় এক বিশাল রোমহর্ষক এডভেঞ্চার । এটা কোনো কুসংস্কার না এটা একটা বিশ্বাস যে নত,নম্র হও প্রকৃতির কাছে ,তোমার যা প্রাপ্য সেটা সে তোমাকে দেবেই।
একটা CBR150,HORNETT160 এবং আমাদের ত্রাতা(এই কেসটা পরে বলবো) ROYALENFIELD THUNDERBIRD X 350 এরা ছিলো আমাদের বাহন। আর ছিলাম আমরা ৪ জন। জগদিশ পাল ওরফে জগা , প্রবীর কুমার গরাই ওরফে ছান্গু দা , অনিশ ওরফে দ্যা ইনটেল্যাকচুয়ালিস্ট এবং আমি শুভদীপ রায় ওরফে রয় ।
পুজোর কোলাহল আমার ভালোলাগেনা এখন । তাছাড়া একটা লম্বা ছুটি পাওয়া যায় তাই পুজোর সময় সাধারনত বাইরেই থাকি । ইচ্ছা ছিলো দশমী কাটিয়ে ফেরার কিন্তু জগার নবমী রাতে প্ল্যানিং থাকে বলে একটু সময়টাকে এগিয়ে আনতে হয় । যার ফলে আমরা ১২ তারিখ ভোরবেলাই বেরোই এবং ১৮ তারিখ নবমী দুপুরবেলায় ফিরে আসি ।
প্রথমদিন -
আগেরদিন একসাইটমেন্টে ঠিকমতো ঘুম হয়নি । বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিলো । জগা আর অনিশ রাত ১ টায় ঘুমিয়েছিলো । আমার ফোনে এলার্ম দেওয়া হয়েছিলো ভোর ৩ টে । কিন্তু আমার ঘুম ভেঙে গেছিলো ২.৩০ এ । সবার ঘুম চটকানোর শুভ কাজটা তাই আমিই করলাম । সবার কাঁচা ঘুমের বারোটা বাজিয়ে ডেকে তুলে দিয়েছিলাম ।
সবাই রেডি হয়ে বেরোনোর কথা ছিলো ৪.৩০-৫ টায় সেখানে বেরোনো হলো ৫.১৫ । বাঙালীর সময়জ্ঞান আরকি !
আমরা আমাদের ধান্নু নিয়ে ৫-৬ কিঃমিঃ সবে মাত্র গিয়েছি অমনি আমার মনে পড়লো জগার পিঠব্যাগটা নিতে ভুলে গিয়েছি।
ওদিকে অনিশ কাজের কাজটা করতে ফিরে গিয়েছিলো কাকীমার(জগার মা) একাধিক ফোনের দৌলতে । আমরা সেই সময়টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছিলাম(ব্যাসিক্যালি আমি ঝাড়ন খাচ্ছিলাম :3 )।
অনিশ আসার পরই শুরু হলো আমাদের টান ।
যতক্ষননা পর্যন্ত আমরা মোরগ্রামের কাছে পর্যন্ত গিয়েছি ততক্ষন ওরা ওদের আসল কাজটা করে দিয়েছে । বাইক হু হু করে টেনে নষ্ট হওয়া টাইমের অনেকটা পুশিয়ে দিয়েছিলো ।
এখানে মিট করলো আমাদের ছান্গু দা ( এই নাম।সিকিম গভর্মেন্ট ভালোবেসে রেখেছে,আমরা সর্বোসাধরনের জন্য আজ উন্মুক্ত করলাম-এই নামের ব্যাখ্যা পরে করবো) ।
নিতান্ত গো-বেচারা ভদ্র টিপিক্যাল ট্যালা এই মানুষটা জাংশন এ না দাঁড়িয়ে ভিতরের দিকে দাঁড়ানোয় আরো কিছুটা সময় নষ্ট হয় ।
ছান্গুদা আসার পর মোরগ্রামের জ্যাম পার করেই শুরু হলো আমাদের প্রকৃত গ্রপের চলা ।
রাস্তায় সবাই ধৈর্য রেখে নিয়ম মেনে যাচ্ছিলাম তখন একটা আলাদা রেলাই লাগছিলো অনেকটা ধূম/ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস সিনেমার সব হিরো হিরোইনের একসাথে হেঁটে যাওয়ার মতোন। পুরো ট্রিপে খাওয়া নিয়ে কেও বিন্দুমাত্র কিপটেমি করেনি উপরন্তু আমার মতো ভুক্কারের সঙ্গে অনিশ ভুক্কারের জয়েন হওয়ায় খাওয়ার মাত্রা বহুগুন বেড়ে গেছিলো । তাই যার যখন যেটা খেতে ইচ্ছা করতো সেটাই খাওয়া হতো ,সেটা থুকপা/মোমো/পরোঠা কিংবা বিরিয়ানীর নাম দিয়ে চালিয়ে দেওয়া পোলাও হোকনা কেনো । তাই কখন কোথায় কি খেয়েছি সেটা আর লিখবোনা ।
ধানতলা অবধি কারোর কোনো অসুবিধা হয়নি । রঞ্জিতদা পাছায় বেল্টের বাড়ি মারা শুরু করলো যখন ধানতলা ক্রস করে ইসলামপুরের দিকে যেতে থাকলাম । একবার বাঁ পাছায় ভর দিয়ে বসি তো আরেকবার ডান । বাইক নিজে চালালে এই সমষ্যা বেশ কিছুটা কম হয় । ওদিকে ছান্গুদার সন্ধ্যার পর বাইক চালাতে অসুবিধা হয় তাই সন্ধ্যার সময় আমি আবার বাইক চালানো শুরু করলাম । ব্যাপারটা এরকম ছিলো যে আমি আমার গাড়ি চালাচ্ছিলাম , জগা চালাচ্ছিলো ওর গাড়ি আর অনিশ চালাচ্ছিল ছান্গুদার গাড়ি। ছান্গুদাকে জগার গাড়িতে বসিয়ে নেওয়া হয়।
৭.৩০ নাগাদ আমরা পৌঁছালাম শিলিগুড়ি । মানে গুসকোরা থেকে শিলিগুড়ি এবং সেটা টাইমের মোটামুটি মধ্যে । আমরা সব জায়গায় হোটেল আগে থেকেই বুক করে রেখেছিলাম কেবল শিলিগুড়ি বাদ দিয়ে । আমার ওখানে জানা একটা হোটেল ছিলো 's.k.lodge' । ওখানে ফোন করে জানিয়ে দিলাম । তারপর সোজা ওখানে ।
এই দিনের বাইক চালানোয় হিরো ছিলাম আমি , বাকি দুটো বাইকের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে টক্করে গাড়ি চালিয়েছি । এই দিন দেখার মতো তেমন কিছু ছিলোনা তাই এই দিনটা কেবল জার্নি ডে । পরেরদিন ভোর বেলায় বেরোতে হবে বলে আমরা খাওয়ার পর পরই শুয়ে পরি । চার চারটে ব্যাচেলর ছেলে থাকতেও কোনোরকম বাওয়াল হয়নি :D , সবাই ভালো মানুষের মতোই শুয়ে পড়েছিলো ।
এই ট্রিপে আমাদের ঠিক হয়েছিলো সবদিন ভোরবেলায় বেরোবো এবং তাড়াতাড়ি লোকেশন পৌঁছে গিয়ে যা করার করবো । পুরো ট্রিপটায় কেবল দু-দিন লম্বা জার্নি করতে হয়েছিলো-এক যাওয়ার দিন ,দুই ফেরার দিন । বাকি দিন গুলো স্বাভাবিকভাবে চালালে ২-৩ ঘন্টার রাস্তার পরেই আমাদের থাকার জায়গা আর আমরা সেভাবেই প্ল্যানটা করেছিলাম ।
দ্বিতীয় দিন-
ভোরবেলায় উঠেই সবাই রেডি হয়ে ৫ টা নাগাদ বেরিয়ে পরি । বাঙালীর টাইমজ্ঞানতো যা হয় আরকি ! ৪.৩০ এর জায়গায় ৫ টা ।
এই দিনটা আলাদাই ছিলো । একটু এগিয়ে যেতেই পেলাম সেবক রোড । আর যারা গেছে তারা জানেন যে কতোটা নির্মল , স্নিগ্ধ এবং শান্ত এই রাস্তা । সবুজ গাছে পরিপূর্ন এই জায়গা আমাদের সকলকে এতোটাই অভিভূত করেছিলো যে আমরা এখানে বারবার থামছিলাম এবং ছবি তুলছিলাম । আমি আবার ফিলে বিশ্বাসী মানে অনেকে আছে কেবল ছবি তুলবে যার জন্য ফিলটাই ঠিকমতো করতে পারেনা আমি ফিল করার পর ফটো তুলি ।
যাইহোক এরপর থেকে একটু এগোলেই শুরু পাহাড় । এক ধারে সবুজ তিস্তা নদীকে নিয়ে পাহাড় বাবাজী সর্পিল আকারে চলে গিয়েছে। এই দিনের জন্য চিন্তা ছিলো কারন এটাই প্রথম পাহাড়ের রাস্তা । তবে প্রাকৃতিক দৃশ্য বাদ দিলে যদি ড্রাইবিং ধরা হয় তাহলে এই রাস্তাতে চালিয়েই বেশী মজা মনে হয়েছে । কারন খুব খাঁড়া বা খাদ নয় রাস্তা গুলো এবং রাস্তার অবস্থাও ভালো । বাইকে ৩.৩০ ঘন্টার মতো রাস্তা । আমাদের খেয়ে দেয়ে , ওখানকার এক বন্ধুর সাথে দেখা করে , বাকিদের হাগু টাগু করে প্রকৃতি দেখতে দেখতে গ্যাংটক যখন পৌঁছাই তখন ১০.৩০ এর উপর ।
হোটল নাথুলাতে ছিলাম ।।খুবই ভালো হোটেল এবং সেটা M.G.Marg এর সংলগ্নেই । আমরা সারাদিন বারবার বেরিয়েছি এবং ঘু্রেছি । সন্ধ্যের দিকে বেরিয়ে বাড়ির জন্য সবাই কেনাকেটা করল । জিনিসগুলি কিন্তু বেশ ভালোই লাগলো । মাঝরাতে আবার জগারা ঘুরতে বেরিয়েছিলো (এতো উদ যে তখন রাত ১ টা বাজে-আমি ল্যাদ খেয়ে শুয়ে ছিলাম) । এখানে পোঁছেই আমরা হোটেলে লাগেজ রেখে পারমিট অফিসে চলে যাই , ডকুমেন্ট সাবমিট করে -প্রসেডিউর কমপ্লিট করে ফিরে আসি কিন্তু পারমিট দেয় পরের দিন ভোরবেলায় । আমরা পরেরদিন ৫.৩০ এ গিয়ে সেটা নিয়ে আসি । সিকিম গর্ভমেন্ট প্রবীর কুমার গরাই এর নাম পাল্টে নাম দিয়ে দেয় প্রবীল ছান্গু,এটাই নামের ব্যাখ্যা। যখন আমরা M.G.Marg হয়ে সেটা আনতে যাচ্ছিলাম তখন দেখি সব দোকান বন্ধ কিন্তু বিপিনবাবুর কারন সুধার দোকান খোলা :3 । আমরা নাথুলা-নাথাঙ্গ-জুলুক রুটের পারমিট পেয়ে যাই । এই দিনের জার্নি থেকে শুরু আমাদের রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির । কারন এখান থেকেই আমরা পাওয়া শুরু করেছিলাম অত্যাধিক চড়াই-খাদ রাস্তা এবং ভাঙা পাথর ভর্তি মারণফাঁদ । এই দিনে বাইক চালানোয় জয়দ্রথ ছিলো ছাঙ্গুদা ।
তৃতীয়দিন -
বেরিয়ে পড়লাম ছান্গুর দিকে । ঠান্ডা হবে সেরকম ভেবেই বেরিয়েছিলাম কিন্তু সেটা যে আমাদের ধারনার সাধ্যাতীত হবে তা ঘূন্যাক্ষ্যরেও বুঝতে পারিনি । ছান্গু লেক অবধি সব ঠিক। এখানে রোপওয়ে চড়লাম । তারপর এগোতে থাকলাম নাথুলার দিকে । ট্যুইস্ট শুরু হতে থাকল এখান থেকেই । রাস্তা খাঁড়া হতে থাকল আর কম হতে থাকল অক্সিজেন । লিটেরালি হাঁড় কাঁপছিলো । রাইডিং গ্লাবস ছেড়ে উলেন মোটা গ্লাবস পরলাম যার ফলে ক্লাচ ও ব্রেক ধরতে অসুবিধা হলেও কোনো উপায় ছিলোনা । তা সত্ত্বেও আঙুলের ডগা গুলো জ্বলছিলো । ভীতরে থার্মাল তার উপর জ্যাকেট । মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ , ঠান্ডা কেবল উগ্র হয়েই উঠছিলো । এখানে একটা চড়াই টার্নিং পয়েন্ট ছিলো যেখানে একটা একটা একটা করে গাড়ি পার হয় । আমি আর ছান্গুদা সোলো রাইড করছিলাম তাই আমরা ওই জায়গা পেরিয়ে যাই । পিছন থেকে আসা একটা গাড়ি আমাদের এসে বলে "তুমলোগোকা দোস্তকা এক্সিডেন্ট হো গায়া" | আমরা ওখানে গিয়ে দেখি জগার গাড়ি পিছনের দিকে স্কিড করে পিছনের দিকে চলে যাচ্ছে । অনিশ নিচে নেমে ধরেও সামলাতে পারছেনা । ছান্গুদা গিয়ে কিছুটা সামলায় । এখান থেকে গাড়িটাকে জগা একা চালিয়ে একটা সেফ এরিয়ায় নিয়ে গিয়ে থামায় । ভয়ে উত্তেজিত অনিশ তখনই বলে থান্ডার বার্ডের লাগেজ সি.বি.আরে তুলে দিতে আর ডাবল ক্যারি হবে থান্ডারবার্ডে । এটাই আমাদের শেষ অবধি মাস্টারস্ট্রোক ছিলো এই জন্যই এটা আমাদের ত্রাতা। আমি মনে মনে ভাবছিলাম ৫ জন এলে কি হতো কারন প্রথমে ৫ জনেরই আসার কথা ছিলো যার ফলে সি.বি.আর আর থান্ডারবার্ডে ডবল ক্যারি করতে হতো। পুরো ট্রিপের চরম মুহূর্ত ছিলো এটাই । সাহস সঞ্চয় করে সবাই আবার এগোনো শুরু করলো আসলে এই উত্তেজনার জন্যই তো এতোদূর যাওয়া । নাথুলায় পৌঁছেই সকলের শ্বাসকষ্ট(আমার হচ্ছিল না-please don't call me hero :3) শুরু । চায়না বর্ডার দেখেই ঠান্ডার ভয়ে সরাসরি ডুকলাম আর্মি ক্যাম্প এ । স্যুপ , বিস্কুট খেয়ে সাহস সঞ্চয় করে জার্নি শুরু করলাম নাথাঙ্গ এর দিকে । এই একটা দিনেই আমরা ভয় পেয়ে ছিলাম ।প্রথমত ঠান্ডার লেভেল সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলাম না উপরন্তু তুকলা থেকে নাথাঙ্গ এর রাস্তা ভয়ানক খারাপ এবং চড়াই-উতরাই । এলিফেন্ট লেকে এসে যখন ছবি তোলা হচ্ছে তখন শুরু হলো বৃষ্টির রেষ । ভয়ে জাস্ট কেবল গুটিয়ে গেছিলাম । ওই ঠান্ডায় আবার বৃষ্টি হলো গোদের উপর বিষফোঁড়া । জগা অলরেডি রেনকোট পরে ফেলেছিলো ঠিক তখনই উদ্ধার করলাম যে সূক্ষধারায় ওটা স্নোফল, বৃষ্টি নয় । ব্যাস সবাই ভীষন খুশী । ৪-৫ মিঃ মতো সেটা হতে থাকে । থামার পরই আমরা এলিফেন্ট লেক ছেড়ে , গলফ কোর্স ছাড়িয়ে এগোতে থাকলাম নাথাঙ্গ এর দিকে । নাথাঙ্গ থেকে ৫-৬ কিঃমিঃ আগে আবার শুরু হলো স্নো-ফল তবে একটু বড়ো আকারে । আমরা এখান থেকে তাড়াতাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু অদৃষ্টের লেখা একটু অন্যরকম ছিলো । শেষ ৩ কিঃমিঃ রাস্তা ছিলো আমাদের পুরো ট্রিপের সবচেয়ে বাজে/রিস্কি রাস্তা কারন রাস্তা ছিলো ভয়ানক চড়াই-উতরাই এবং পাথরকুচিতে ভর্তি । একটা সময় আমি সবার পিছনে পরে গিয়েছিলাম এবং চড়াই রাস্তায় একসেলারেট করতে গেলেই চাকা পাথরে স্কিড করে ঘুরে যাচ্ছিলো আবার একটু চড়াই উঠে থেমে গেলেই হাই চড়াই এঙ্গেল এর জন্য ব্রেক ধরে রাখলেও গাড়ি স্কিড খেতে খেতে পিছনের দিকে চলে আসছিলো । এমতব্স্থায় আমি খাদের ভয়ে ডানদিক ছেড়ে যখন বাঁদিক যাচ্ছিলাম পায়ের ব্রেক মারার ফলে রাস্তার মাঝে থাকা পাথরকুচিতে স্কিড করে পরে যাই । স্পিড একদমই কম ছিলো।তাই ভয়ানক কিছুই ঘটেনি কিন্তু ঠান্ডায় কাবু হয়ে থাকা আমার পক্ষে ওই গাড়ি দাঁড় করিনো খুব কষ্টকর ছিলো । প্রথয় চেষ্টায় পারিনি । অতিরিক্ত মোবিল বেরিয়ে গেলো । সামনের বন্ধুদের ডেকে আওয়াজ পেলাম না । বুঝলাম ওরা ওদের সমষ্যায় জর্জরিত , এগিয়ে গিয়েছে । দ্বিতীয় এটেম্প নিয়েই তুলে ফেললাম গাড়ি । আরো সতর্কিতভাবে গাড়ি তুললাম উপরে । যে মুহূর্তে খুশী হতে যাবো তখন দেখি রাস্তা ভয়ানক উতড়াই । ফাস্ট গিয়ারে গাড়ি এনে , দুটো ব্রেক আর ক্লাচ ধরে গাড়ি নামাতে থাকলাম । আমি জানি একটু এদিক ওদিক হলেই আমি পেপারের ফ্রন্ট পেজে চলে আসবো । এইসব কমপ্লিট করে যখন নাথাঙ্গ ডুকলাম তখন যেনো ধড়ে প্রাণ ফিরে এলো । আমরা গাড়ি পার্ক করছি এমন সময় আলাপ হলো লম্বা রোগা স্টাইলিশ , চাপ দাঁড়ি রাখা আমাদের নতুন সদস্য তথা ট্রাভ্যেলর অমিত দার সঙ্গে ।
সবাই এখানে এসে লাগেজ খুলেই লেপের তলায় । আমি ততক্ষনে মানসিকভাবে তৈরি হয়ে নিয়েছি ঠান্ডার জন্য । ফ্রেশ হয়েই কমনরুমে চলে গেলাম । ওখানে চিমনীর মতো একটা জিনিস /গোখারো দিয়ে ঘর গরম করা হয় । আমি আর অমিতদা সিকিমের রাজনীতি থেকে শুরুকরে অনেক বিষয় নিয়ে ওদের সাথে আলোচনা করছিলাম এমন সময় আবিষ্কার করলাম যাদের হোম স্টে তে আছি সেই মহিলা ওখানকার পঞ্চায়েত প্রধান এবং এটা নাথাঙ্গ এর প্রথম হোম স্টে । রাত হলেই সবাইকে ডেকে নিলাম খাওয়ার জন্য । সবাই খেয়েই আবার লেপের তলায় । ঘুমাতে এখানে সবারি একটু অসুবিধা হয়েছে অত্যাধিক ঠান্ডা আর উচ্চতার কারনে তবে ছান্গুদার সবচেয়ে বেশী সমষ্যা হয় । রাতে মাথা ব্যাথা এবং বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছিলো স্যারের । আর উনিই একমাত্র যিনি লাগেজের থেকেও বেশী ওষুধ বেশী নিয়েছিলো । সকালে উঠে স্নান করতে চাইলে ওনারা বারন করলো , বললো অসুস্থ হয়ে পরবো তাই ঠিক করলাম জুলুক পৌঁছে স্নান করবো । অমিত দার ঠিক ছিলো ভোরবেলায় বেরিয়ে যাবে কিন্তু সকালে অমিত দা এসে বললো চলো তোমাদের সাথেই বেরোবো । আর এখান থেকেই অমিতদা হয়ে উঠলো আমাদের একজন ।
লাগেজ প্যাক করে , ব্রেকফাস্ট করেই আমরা নাথাঙ্গ ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম জুলুকের দিকে .....
চতুর্থদিন -
নাথাঙ্গ ভ্যালি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম । কিছুটা রাস্তা এগোনোর পরেই পেলাম সেই বিখ্যাত সিল্করুট । কিন্তু আমাদের রসে বসে বেরোনোর ফলে থাম্বি ভিউ পয়েন্ট ডুকতে দেরি হয় আর থাম্বি থেকে সিল্ক রুট ও কাঞ্চনজঙ্ঘা ভালো করে দেখতে হলে সকাল ৬-৮ টার মধ্যে ডুকতে হবে । আমরা ওই সময় কেবল মেঘের খেলাই পেয়েছিলাম । ৩ ঘন্টা মতো অপেক্ষা করেও ফল হয়নি । তবে আমরা এখানে হেরে যাইনি । ঠিকই করে নিয়েছিলাম যে পরেরদিন ভোরে আবার ব্যাক করবো দেখার জন্য। আমরা যেহেতু আগেরদিন অনেক কষ্ট পেয়েছি ঠান্ডায় তাই সবাই যতোটা পেরেছে প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছিলো । আমি জিন্সের তলায় দুটো ট্রাকস্যুট আর জ্যাকেটের তলায় দুটো ফুল থার্ম্যাল, সোয়েটার পরেছিলাম । তাও সেটা কম মনে হচ্ছিলো । রাস্তার মনোরম দৃশ্য অনুভব করতে করতৈ নামতে থাকলাম জুলুকের দিকে আর যতোই নামতে থাকলাম ততোই পেতে থাকলাম মেঘে পূর্ন সিল্করুট । আমার সামনের গাড়িকে দেখা যাযনা এমন রাস্তা কিন্তু এটাই আমাদের মোহিত করেছিলো । অসাধারন লাগছিলো মেঘ চিড়ে সর্পিল রাস্তা ধরে নেমে যেতে । প্রত্যেকে তাদের।ইনডিকেটর জ্বালিয়ে দিয়েছিলো যাতে পিছনের জনের দেখতে সুবিধা হয় । আমার আবার একটা ভীষন বাজে দোষ আছে কোনো সুন্দর দৃশ্য চোখে পরলে মন সেদিকে চলে যায় । আর এই রাস্তায়ও সেটা হচ্ছিলো । শেষে আমি জগার নিয়ম ধরলাম যে যেখানে ভালো লাগবে সেখানে সাইডে দাঁড়িয়ে দেখে নাও তারপর গাড়ি চালাও । থাম্বি থেকে বোধহয় ১৪ কিঃমিঃ জুলুক । আমরা এখানে এসে পার্কিং করে ডুকে যাই হোম স্টে তে । এখানকার হোম স্টে ছিলো অসাধারন , যেমন তার ভিউ তেমন তার ঘর গুলি । আমরা দুটো ঘর নিয়েছিলাম । একটায় আমি আর অমিতদা , অন্যটায় বাকি তিনমূর্তি । ফ্রেশ হয়ে একটু পরে ঘুরতে বেরোলাম পাশেই । খাওয়ার পর মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করছিলো বলে একটা দোকানে মিষ্টার খোঁজ করায় বুঝলাম এখানে মিষ্টি মানে চকলেট আর সনপাপড়ি । ১০ টা সনপাপড়ি।নেওয়া হয় যার ৯ টা নষ্ট হয় । একটা আমি কোনোরকমে উদ্ধার করেছিলাম । ওটা কারোর।মাথায়।ছুঁড়ে মারলে তার মাথা ফাটা অনিবার্য । ফেরার সময় একটা দৃশ্য দারুণ লাগলো ; একজন লেডি আর্মি আমাদের সামনে থেকে এগিয়ে তাদের ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো আর যাওয়ার পথে যতোজন আর্মি ছিলো প্রত্যেকে স্যালুট করলো । EMPOWERMENT ....
সন্ধ্যের পর ডাইনিং রুমে বক্স বাজিয়ে আমাদের জলসা হলো । রাতে খেয়ে দেয়ে সবাই শুয়ে পড়লাম কারন পরেরদিন ৫ টা নাগাদ ব্যাক করে আবার পাহাড় চড়ে থাম্বি যাওয়া হবে , প্রায় ১৪ কিঃমিঃ ....
পঞ্চমদিন-
ভোরে এতো ল্যাদ লাগলো আর তাছাড়া ভাবলাম এই মনোরম পরিবেশে কিছুক্ষন একা সময় কাটাই তাই বললাম তোমরা যাও । কিন্তু ওদের বেরোনোর মুহূর্তে আমারো ইচ্ছা করায় বেরিয়ে পড়লাম । থাম্বি পুরোটা যেতে হয়নি তখনই মনে হলো যদিনা যেতাম তাহলে কতটা বড়ো ভুল করতাম । কাঞ্চনজঙ্গা মাথা তুলে আমাদের দিকে চেয়ে । থাম্বি পৌঁছালাম ৬.৩০ দিকে । মেঘ নাই , সিল্করুট দারুণ পরিস্কার । আর এতো সুন্দর , পরিস্কার আর বড়ো কাঞ্চনজঙ্গা আমার এই প্রথম তোখে পড়লো । কি অপূর্ব সেই দৃশ্য ! কি মনোরম ! কিছুক্ষন আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে গেছিলাম। প্রায় ১.৩০ পর্যন্ত এরকমছিলো তারপর আবহাওয়া খারাপ মানে মেঘলা হতে শুরু করলো । এর মধ্যে আমরা নানা মানুষের সঙ্গে গপ্পো করতে লাগলাম , তাদের কথা শুনলাম , খেলাম ।এবার আমাদের নামার পালা , জুলুকে নয় এক্কেবারে হৃষিখোলা । আমরা ফিরে এলাম জুলুকে । ব্রেকফাস্ট করে , লাগেজ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম হৃষির দিকে । প্রায় ৬০ কিঃমিঃ রাস্তা তবে রাস্তা খুব একটা খারাপ নয় । সুন্দর মনোরম পরিবেশ , মাঝে মাঝে জঙ্গল ।।সাথে পেলাম মেঘ চিড়ে এগোনোর অনুভূতির পুনরাবৃত্তি । নাক থেকে জল পড়াটা কমতে লাগলো নামার সাথে সাথে । এতোদিনে নাকের ডগায় ঘা হয়ছ গেছিলো ঠান্ডায় । হৃষিতে নামার পর থেকে সেটা কমতে থাকে । হৃষি ডোকার কিছু কিলোমিটার আগে একটা ছোট্ট গ্রামে দেখি দূর্গা পুজো হচ্ছে । চঙ চঙ করে ৪ গাড়ি থেমে গেলো । আরে বাবা দুগ্গা পুজো বলে কথা । আফটারঅল বাঙালী তো , মা দেখা দেবেন না তা কি হয় !! ওনারা আমাদের আপ্যায়ন করলেন , বসালেন । চা খাওয়ালেন , ফল কেটে আনলেন । আমরা বেশ কিছুটা সময় ওখানে কাটিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম । হৃষিখোলা ইকো রিসর্ট খুঁজে পেতে আমাদের বেশ চাপ হয় । আর সেখানে যেতে যে ভাঙা পাথরের রাস্তা দিয়ে যেতে হলো সেটা ভয়ানক । সবাই ভাবছিলো ওঠানোর সময় তুলবে কি করে । তবে আমরা রিসর্টটার কাছে ঠিক চলে গেছিলাম । সামনে হৃষি নদী কুলু কুলু শব্দে বয়ে চলেছে আর দুদিকে পাহাড়ি জঙ্গল । ফ্রেশ হয়ে গরম গরম নুডল চা আর মোমো খেয়ে নিলাম ।
একটু আড্ডা মেরেই ঠিক করে নিলাম বনফায়ার/ক্যাম্পফায়ার করবো । ওরাই এরেঞ্জ করে দিলো । আর সঙ্গে দিলো এক বোতল রেড ওয়াইন । বাউল গান , নদীর কুলু আওয়াজ আর বনফায়ার । বিভোর হয়ে গেছিলাম । বেশ কিছুক্ষন বসে ফিরলাম ঘরে । পরেরদিন হলো দুঃখের কারন আগামীকাল থেকে মূলত ফেরার পালা এবং যেতেও হবে অনেকটা । খেয়ে দেয়ে তাই আমরা আমরা সটান ঘুমের জগতে....
ষষ্ঠদিন-
এইদিনটা বেশ ভাইটাল , ভাইটাল মূলত ফেরার জন্য হলেও এইদিনে ইনক্লুড ছিলো আমার প্র্যারাগ্লাইডিং সিডিউল । আমাদের প্ল্যানিংটা ছিলো আমরা সকালে ফোন করে জিঞ্জাসা করে নেবো হচ্ছে কিনা কারন ওয়েদার খারাপ থাকলে প্যারাগ্লাইডিং করায়না । যদি প্যারাগ্লাইডিং হয় তাহলে ডেলো-কালিম্পং রাস্তা হয়ে ফিরবো নাহয় লাবার রাস্তা ধরে ফিরবো । ফোন করে জানলাম গ্লাইডিং হবে । বেরোতে অনেকদেরি হলো । গাড়ি তুলে লাগেজ গুছিয়ে গাড়ি ছাড়তে ১০ টার বেশি হয়ে গেলো । একজন পোর্টার এসেছিলেন , বজ্রকঠিন শরীর । পরিশ্রম করেন বোঝা যায়। আমাদের গাদা গাদা লাগেজ একটা বাঁশের পিঠ ব্যাগের মধ্যে নিয়ে নদী পার করে দিলেন । কিছু সময় কিছু ঘটনা মন উদাস করে দেয় । এটাও সেরকম একটা । মনে পরে গেলো আমরা কতটা প্রিভিলেজ । মনে পরলো কজন ভিখারী দেখৃআম সিকিমে ? এরা মানুষ নয় ? এদের দুঃখ নেই ? পরিশ্রমে কতটা বিশ্বাসী । ডেলো ডুকতে ১২ টা বেজে গেলো। প্যারারাগ্লাইডিং এর ড্রেস পরে রেডি হয়ে নিলাম । একটা টিলার উপর রেডি হয়ে আছি । আরো কয়েকজন রেডি হয়ে আছে ......ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপছি আর সময় কেটেই চলেছে কিন্তু ওয়েদার যে খারাপ হয়েছে সেটা আর ঠিক হচ্ছেইনা । ২ ঘন্টা ওরম ড্রেস পরেছিলাম শেষে ওরাই বললো স্যার শায়দ আজ নাহি হোগা আপ ব্যায়ঠে মাত রাহিয়ে । কি আর করবো , আমাদের আজ অনেকটা যেতেও হতো । দুঃখ পেলাম কিন্তু সবকছুর একটা কারন থাকে জানি ....এটারও কারন আছে ....
বেরিয়ে পরলাম । আমাদের ট্যাগলাইন ছিলো যতটা যাওয়া যায় । তবে মনে মনে ইচ্ছা ছিলো রায়গঞ্জ অবধি যাওয়ার । সন্ধ্যার পর পর আমাদের স্পিড(আমার বেশি করে) কমতে থাকলো রিফলেক্টিং এর জন্য । রাত ৮ টা বাজে , এই প্রথম আমরা সন্ধ্যার পর গাড়ি চালাচ্ছি । আমার , ছান্গুর বেশ ঘুম পাচ্ছিলো এটাও বুঝতে পারছিলাম বাকি দঙজনেরও ঘুম পেয়েছে কিন্তু কোপ আমাদের গলায় পরছে। ৯ নাগাদ ডালখোলা পৌঁছালাম । এরপর আর গাড়ি চালানো ঠিক হবেনা মনে করেই এখানে আমরা হোটেলে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম । আর এখানেই সেই বিখ্যাত ১৬০ টাকার বিরিয়ানি রুপী পুলাও খেলাম । যাইহোক ঘরে এসে ড্রেস চেঞ্জ করতে পারিনি , শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে মরা হয়ে গেছিলাম সবাই ....
সপ্তমদিন -
ভালো-খারাপ , রাত-দিন এগুলো একটা আরেকটাকে পরিপূর্নতা দেয় তাও আমাদের মন মানেনা । তাই ফেরা সবসমই দুঃখের । সেই একঘেঁয়ে জীবন , সেই বসের কথা শোনা , বৌউয়ের মুখ ঝামটা ইত্যাদি ইত্যাদি । কিন্তু ফিরতে তো হবেই । এটাই চিরন্তন সত্য । মোরগ্রামর কিছুটা আগে এসে থামলাম । এটা বিদায় মুহূর্ত । অমিতদার সঙ্গে কালিম্পং এ আর বাকিদের সঙ্গে এখন ...
If you want to go long then go with partner
And if you want to go fast then go solo...
বাকি ১৫০ কিঃমিঃ একাই চালিয়ে ফিরেছি থেমেছি একবার ; কৃষ্ণনগরের পান্থতীর্থ এ । খেয়ে ফিরে এলাম সরাসরি জাগুলিতে , আমার সেফজোন ।
No comments:
Post a Comment