Friday, 16 February 2018

গুজরাট মডেল ? মিথ্যা না ভাইব !

বাঁদিকের ছবি গুলি যা আমাদের কাছে তুলে ধরা হয় এবং ডানদিকের ছবিগুলি যা আমাদের বাস্তবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় | কেনো ট্যুরিস্ট স্পট দিয়ে সবকিছু ঢাকার মতো পর্দা গুজরাটে অন্তত নেই |

                          জমজমাট জায়গায় থাকলে অথবা কয়েকজন প্রিয় বন্ধুর সাথে থাকলে আমার কোনো সময়েই বাড়ির কথা মনে পড়ে না এটি ধ্রুব সত্য | রীতিমতো বাড়ি থেকে তখন ফোন আসে ফোন না করার কারণ জানতে চেয়ে ! যদিও এইবারের অভিজ্ঞতা বেশ কিছুটা আলাদা | চাকরির দরুন গুজরাটে আসা ,প্রথমে আহমেদাবাদ স্টেশন সেখান থেকে 6 ঘণ্টা বাসের জার্নি করে রাজকোটের সাপার গ্রাম(গ্রাম বলতে যা বুঝি তার ছিটেফোটা গুণ সেখানে অন্তত ছিল না বরং কলকাতার বেলগাছিয়া অঞ্চলের সাথে তুলনা করা চলে তবে সাপার এ প্রচণ্ড ধুলো এবং বেলগাছিয়ার তুলনায় বেশ কম বাড়ি তবে ‘ইন্ড্রাস্ট্রি’ এর অভাব নেই)|বহু দিনের ইচ্ছেই ছিল গুজরাট দেখার অন্তত রাজকোট ,আহমেদাবাদ ও গির অরণ্য দেখার প্ল্যান অনেক আগেই করে রেখেছিলাম | লোক মুখে শুনে বেশ হিংসেই হতো সকলেই গুজরাটের নাম জপ করতো ,যারা গুজরাটের বুকে স্বপ্নেও পা রাখেনি তারাও করতো যা আমায় গুজরাট দেখার ইচ্ছায় পরিণত করেছিল ,ভাগ্য সঙ্গ দিলে চিন্তা আর কোথায় !  কর্পোরেটের প্রতি গুজরাটের যেরকম ভাবমূর্তি তাতে আমি সকলের মতো স্বপ্নের নগর দেখবো বলে আশা করে যায় নি বরং মাথার মধ্যে যেরকম গুজরাটের চিত্র ঘুরছিল বাস্তবে সেরকমই দেখলাম| 

আমেদাবাদ ও রাজকোট এবং তার পার্শবর্তী অঞ্চল সমূহ :-আহমেদাবাদ স্টেশনে নেমে চোখে পড়ার মতো দুটি দৃশ্য ফুটে ওঠে প্রথমত ,গুজরাটের বুকে আহমেদাবাদ স্টেশন জুড়ে অধিকাংশই মুসলিম আধিক্য ( এই জিনিসটি আমার অনুমানের বিপরীত ), দ্বিতীয়ত , স্টেশন চত্ত্বরে মেয়েদের আধিক্য বেশী | গুজরাটে প্রবেশের দিন স্টেশন চত্ত্বরে ও আহমেদাবাদে  অল্প সময় ছিলাম তাই এখানকার অবস্থা সম্বন্ধে আরও জানার জন্য ফেরার 6 দিন আগে আহমেদাবাদ চলে আসি রাজকোট থেকে ,ততদিনে রাজকোটের কুষ্টি মোটামুটি আমার নখদর্পনে | এক বন্ধুর মাসির বাড়ি 2 দিন থেকে হোটেলে উঠি | খাবারের বিভিন্নতা উপভোগ করার সাথে সাথে আমার আর একটা প্রধান কাজ হয়ে উঠেছিল সকাল ,বিকেল এবং মাঝরাতে আমেদাবাদ ঘুরে বেড়ানো ও অটোচালক দের সাথে কথাবার্তা | পুরো আমেদাবাদ শহর জুড়ে আমার চোখে মুসলিম আধিক্য পড়ে এবং এখানে একটি জায়গা রয়েছে শুধুমাত্র সেখানেই নাকি 4 লক্ষ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ থাকে | কিলোমিটারের পর কিলোমিটার জুড়ে রাস্তার নানা দিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের পতাকা দেখে বেশ অবাকই হয়েছিলাম | আমেদাবাদ শহর টি খুবই জমজমাট ,নানারকম খাবারের সমন্বয় বর্তমান তবে খাবার গুলি বিশেষত মিষ্টি বেশী কেনার পূর্বে একবার টেস্ট পরখ করে নেওয়া উচিত যাতে পরে ফেলে দিতে না হয় |  গুজরাট জুড়ে যে নন-ভেজের সমস্যা তা আমেদাবাদে বিন্দুমাত্র নেই তবে মুসলিম আধিক্য না খাদ্যাভ্যাস  তার কারণ কিনা অল্পসময়ে বোঝাসম্ভব হয়নি |  ঘুড়ি এই শহরের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য ,এখানকার মানুষ ঘুড়ি ওড়াতে খুবই ভালোবাসে এবং অবাক লাগবে হয়তো এখানকার অধিকাংশ দোকান ঘুড়ি এবং সুতোর ও দোকানগুলি বেশ জমজমাট | এখানাকার আকাশে ঘুড়ি সর্বদা চলমান চিত্র প্রেক্ষাপট | রাতে বহু সংখ্যক দোকান খোলা থাকে (ঘুড়ির দোকানও) | আমেদাবাদ জুড়ে ট্যাক্সির উপস্থিতি একদম ই পাই নি বরং অটো এখানে স্থান সমন্বয়ের কাজ করে তবে কলকাতার থেকে বেশী ভাড়া হলেও অনেক দূর অবধি যাওয়া যায় এখানকার অটো গুলি করে যেমন বহু কিলোমিটার গেলে 20 টাকা মতো পড়বে আবার উঠলেই হয়তো 10-20 টাকা নিয়ে নেবে | গভীর রাত হোক কিংবা দিন এরাই ভরসা ,তবে সুযোগ বুঝে কোপ মারতেও ছাড়েনা | প্রথম দিকে উল্লেখ করেছিলাম এখানকার মেয়ে আধক্য নিয়ে | আমি দেখেছিলাম অধিকাংশ মেয়েরা বোর্খার মতো সাজে রংবেরং এর কাপড় মাথায় জড়িয়ে রেখেছে | কৌতুহলের সাথে এক অটোওয়ালা কো জিঞ্জেস করলে বলে ‘বাহার কেয়া কার রাহা হ্যায় দেখ না লে ইস লিয়ে এইসা কাপড়া মু মে লাগা লেতা হ্যায় ওয়ারনা ম্যায় ভি মহমেডাম হু ,মুসলিম লোগ কালা কাপড়া ইসতেমাল কারতা হ্যায় |’ এর পরেও কয়েকদিন থাকায় বুঝতে পারলাম আদৌতে ওরাও মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত ফ্যাসনের নতুনত্বে এরকম রং এর বাহার এসেছে | তবে মাথাটুকু বাদ দিলে বাকীটা পোশাকে কিন্তু আধুনিকতার ছাপ রয়েছে | মিনি বা মাইক্রো মিনি নয় তবে জিন্স ,টপের প্রচলন এখানে বহুত এবং সেই পোশাকে তাদের বেশ সাবলীন ই লেগেছে |আবার কাপড় ব্যবহার করলেও  মুখ ডাকা নয় ,মুখ কিন্তু খোলা তবে মাথা গলা ডাকা | অবাক হওয়ার আরও বাকী ছিল ,কলকাতা সহ অনেক রাস্তায় আমি এতো সংখ্যায় মাঝরাত্রিতে মেয়েদের হাঁটতে কম দেখেছি যা আমেদাবাদের রাস্তায় হামেশাই দেখা যায় তবে রাতে জমজমাটের পরিবেশের দরুণ বলেই এটা সম্ভব হয়েছে আমার মনে হয় | আহমেদাবেদ শহরটি কোথায়ও শ্যামবাজার হাতিবাগান বেলগাছিয়ার মতো জমজমাট তো কোথাও আবার সল্টলেক ,নিউটাউন সিটির (গান্ধীনগর) সমার্থক | রাস্তা পার হওয়ার সময় বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত কারণ মৃত্যু আশঙ্কা  রয়েছে বহু শতাংশ | প্রথমত ,যতই বড়ো রোড হোক সিগনাল না থাকার চান্স সবচেয়ে বেশী ,থাকলেও একসাইডের জন্য থাকবে | দ্বিতীয়ত ,প্রচুর সংখ্যক গাড়ি চলাচল করে বস্তুত ফাঁকা রাস্তা দিনের বেলায় দেখার সুযোগ হয়নি | তৃতীয়ত , অটো বাইক চালকরা নিজেদের ধুমের হিরো মনে করেন | গুজরাটের অধিকাংশ মানুষকে আমি খারাপ ব্যবহার করতে দেখেছি | একটি উদাহরণ ,খাবারের দোকানে গিয়ে খাবার দিতে বলি ,চাটনি আমি খেতে পছন্দ করিনা তাই চাটনি দিতে বারণ করি কিন্তু লোকটি প্রচণ্ড রেগে গিয়ে বলে “ খানা নাহি মিলেগা |” এরকম বহু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি আমরা বেশ কয়েকজন | বহু মানুষ রাজকোট বলতে পাগল কিন্তু রাজকোট ধূলোময় ,অত্যন্ত নোংরা জায়গা  | এখানকার বস্তির ধরন আমি কলকাতার কোনো স্থানে দেখেছি বলে মনে পরেনা |এই শহরটিতে মেয়েদের সংখ্যা অত্যন্ত বিরল এবং আমেদাবাদের পুরো উল্টো | পুরোপুরি হিন্দু ডমিনেন্ট এরিয়া হওয়া সত্ত্বেও আধুনিকতার ছাপ এদিকে একদমই পরেনি |

মূল্যায়ন (কর্পোরেট সেক্টর ,শ্রমিকদের হাল) :- গুজরাটের উন্নতির কারণ হিসেবে অনেকে দেখায় সেখানে বহু কোম্পানীর সমাবেশ ও চাকরির সুযোগ | এটি সত্যি যে এখানে আমাদের চিন্তা শক্তির বেশী কোম্পানী রয়েছে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে  (আমেদাবাদে আছে কিন্তু আমেদাবদ শহরের বাইরে বেশী রয়েছে) | আমেদাবাদ ,রাজকোট শহর এবং তাদের মধ্যবর্তী 6 ঘণ্টার জার্নি এর দরুন বেশ ফাঁকা অঞ্চল দেখতে পেলেও চাষের জমি দেখতে পাইনি | প্রসঙ্গত , এখানে চালের দাম বহুত এমনকি হোটেলে 20 টাকা দিয়ে শুধু ভাত নিতে হবে যার পরিমাণ একটি স্যূপ চামচের 3-4 গুণ | হাইওয়ে গুলি ছাড়া অন্তবর্তী রাস্তা গুলি অর্থাত শুধুমাত্র সাধারণের ব্যবহারের রাস্তাগুলির অবস্থা খারাপ | বুঝতে দেরী হয়নি কর্পোরেট দের প্রয়োজনীয় জিনিস সামগ্রী দ্রুত পৌঁছে দিতে হাইওয়ে এবং তাদের ব্যবহারের রাস্তাগুলি ঝা চকচকে সেগুলি ব্যতীত রাস্তাগুলি শ্রীহীন | খোদ রাজকোট , আমেদাবাদ(তুলনামূলক কম),  শহরে জলের চরম সমস্যা , পুরো গুজরাটের চিত্র ফুটিয়ে তোলে | প্রতিমাসে ট্রফিক পুলিশ অটোওয়ালাদের কাছ থেকে 50 টাকা করে নেয় এমনকি  কুপোনের সিস্টেম (রাজকোট) রয়েছে ,12 টি কুপোন দেওয়া হয় সারা বছরের জন্য ,ওই প্রতি কুপোনের জন্য 50 টাকা করে দিতে হয় |এখানে বহু মন্দির রয়েছে নানা স্থানে (বহু অফিস ,ইন্ডস্ট্রি এর মধ্যেও রয়েছে)  | এখানকার লোকজন রাজনৈতিক আলোচনার খোসগপ্পে খুব একটা মাতামাতি করেন না | আমাদের কোম্পানীতে দিন শুরু হতো একটি ছবির সামনে দাঁড়িয়ে এবং সেই ছবিতে কত গুলি ভগবানের ছবি রয়েছে আমি গুণে উঠতে পারিনি সাথে ছিল কোনো এক ঠাকুরের গান |  আপনি যদি ডিম (ননভেজ) খেয়ে কোনো গুজরাটি মানুষের বাড়ির সামনে ভুল বশত ফেলেন তাতে  আপনার সাথে তো সম্পর্ক থাকবেই না বরং কয়েকটা চড় থাপ্পর খেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই |এখানকার শ্রমিকদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় , পুরো সৌরাষ্ট্র জুড়ে (তার বাইরের অনেক অংশ জুড়েও রয়েছে) দৈনিক 12 ঘণ্টা অমানুষিক খাটার পর তারা হাতে পায় মাত্র 230 টাকার আশেপাশে এমনকি অনেক সময় 24 ঘন্টাও কাজ কতে হয় যার টাকা তারা পাননা | আরও খারাপ অবস্থা কন্ট্রাক্ট শ্রমিকদের ,দৈনিক খাটনি সময়ের কোনো ঠিক তাদের থাকে না | কোম্পানীর উপরের শ্রেণী তাদের উপর অত্যন্ত নির্মম ব্যবহার করে যা তাদের সহ্য করতে হয় | ইউনিয়ন যাতে গড়ে উঠতে না পারে তার জন্য তারা বাইরের শ্রমিক নিয়ে আসে এবং এক্সিডেন্টাল কোনো ঘটনা ঘটলে কোম্পানী তার দায় কোনো ভাবেই নেয় না |  এত দিন তাদের অবস্থা শুনে এসেছি ,নিজের চোখে দেখে প্রকৃত অবস্থা টা বুঝতে পারলাম | আমাদের কল্পনাতীত কষ্ট তাদের প্রতিমূহুর্তে তাদের সহ্য করতে হয়| এরকম করুন অবস্থা আমার চোখে এই প্রথম | এরপরেও অবাক হওয়ার বাকী ছিল কারণ জানতে পারি গুণগত ভালো মানের কলেজ এখানে নগন্য |এমনকি শিক্ষার হার বেশ কম যার জন্য যারা অল্প শিক্ষিত (একাডেমিক) তাদের চাকরী পেতে অসুবিধা হয়না এবং যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম তারা শ্রমিকের কাজ করেন( অসংখ্য কোম্পানী রয়েছে তাই অসুবিধা হয়না) | এটাই হলো ওখানে বেকারত্বের হার কম হওয়ার কারণ |

খাদ্য সংস্কৃতি :- তেল জাতীয় খাবার খেতে এরা বেশ পটু | রুটি এরা অধিক পছন্দ করেন ,খাবারে টকের দিকটা একটু ভারী এমনকি ছাঁস নামের একটি পানীয়(টক দই ও জলের মিশ্রন) খুবই প্রিয় এখানকার মানুষদের  মধ্যে| লঙ্কা ব্যবহার করলেও তা ঝালহীন |মূল ফাস্টফুড বলতে এরা বড়া পাব ,ধাবেলি এই সবই বোঝেন এবং পূর্বেই উল্লেখ করেছি এরা অধিকাংশই নিরামিষ আহার করেন |

পুনশ্চ - গান্ধীনগর বাদ দিলে গুজরাট প্রকল্প বলে আর কিছুই থাকেনা তবে তা দিয়ে পুরো গুজরাট কে কোনো মতেই তুলে ধরা যায় না |

বিঃদ্রঃ :-ফেরার পথে তিনজন ব্যাক্তির সাথে আলাপ হয় ,দুজন (ঘুরতে গিয়েছিল)অসমের একজন (ওখানে কাজ করেন)আসানসোলের | তাদের মতামত আমার সাথে হুবুহু মিলে যায় | তাদের  মূল বক্তব্য নিজের ভাষায় তুলে ধরছি - তিনজনই বলেন যা শুনেছিলাম তার বিন্দুমাত্র এখানে নেই , যা ভেবেছিলাম তার উল্টো |  সিটি বলতে যা বুঝি তার কিছুই নেই | এতো গুজরাট গুজরাট যে করে কেনো করে বুঝলাম না !

পুনশ্চ 2 :- আমার অভিজ্ঞতা মূলত রাজকোট ,আমেদাবাদ ও তার পার্শবর্তী অঞ্চল সমূহ নিয়ে যা লেখাটির সীমাবদ্ধতা তবে এই দুটি শহর গুজরাটের প্রধান ও মূল দুটি শহর যা থেকে পুরো গুজরাটের একটি চিত্র প্রস্তুত করা যায় | তবে আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি বাকী অংশ গুলির অবস্থা একই রকম বরং বহু অংশে আরও খারাপ পরিস্থিতি |

No comments:

Post a Comment